বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (আর্ট) বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। এ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় ওয়াশিংটন। আর এ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের আমদানি নীতি চায় দেশটি। বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) তিন দিনের সফরে প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) ব্রেন্ডান লিঞ্চ। তার মূল বৈঠকটি হবে আজ মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য সচিব (চলতি দায়িত্ব) ও অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আবদুর রহিম খানের সঙ্গে। যেখানে দু’দেশের বাণিজ্যসংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।
এ বৈঠকের পর ইউএসটিআর যাবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সেখান থেকে আবারও সচিবালয়ে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের কথা রয়েছে। এ ছাড়া দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
পরদিন বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। শেষ দিনে বাংলাদেশে শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য খাতের নেতাদের সঙ্গে মোট চারটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে।
ব্রেন্ডান লিঞ্চের সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিশনের মুখপাত্র পূর্ণিমা রাই জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করতে ৫-৭ মে ঢাকা সফর করছেন। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে অংশীদারিত্বের প্রত্যাশা করে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তি উভয় দেশের বাজারে প্রবেশ সহজ করবে, বিনিয়োগের বাধা দূর করবে এবং বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করবে।
সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন আর্ট চুক্তি (পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি) নিয়ে বিভিন্ন স্তরে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। ফলে এ চুক্তির মসৃণ বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান ওয়াশিংটন। বাণিজ্যের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের বিষয়ে চাপ থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ‘অতিরিক্ত উৎপাদন’ ও ‘জোরপূর্বক শ্রম’ দিয়ে ঢাকাকে চাপে রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন।
চলতি মাসে এ বিষয়ে বাংলাদেশে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতি উৎপাদনের অভিযোগ করে আসছে তারা। পাশাপাশি শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়েও অভিযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে, গত মার্চে ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ধারা ৩০১-এর আওতায় তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর লক্ষ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি ও উৎপাদনব্যবস্থা বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে মার্কিন শিল্পের ক্ষতি করছে কি না, তা যাচাই করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখবে তারা।
বৈঠকের শুরু থেকেই পিছিয়ে থাকবে বাংলাদেশ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বৈঠক যেভাবে শুরু হবে, তাতে মে মাসের শুনানি মাথার ওপর নিয়ে বসতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ফলে শুরুতেই দরকষাকষিতে পিছিয়ে থাকবে ঢাকা। এর সঙ্গে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আমদানি নীতি নিয়ে ঢাকার কাছে জানতে চেয়েছে ওয়াশিংটন। তারা চাইছে আর্ট চুক্তিকে মাথায় রেখে ঢাকা যেন আমদানি নীতি ঢেলে সাজায়। ফলে একদিনে শুনানি আর অন্য দিকে আর্ট চুক্তির বাধ্যবাধকতা, বাংলাদেশ বিষয়গুলো সংগতি রেখেই আমদানি নীতি সাজাবে। এছাড়া বৈঠকে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টি আসবে। কারণ আর্ট চুক্তির কারণে রাশিয়ার তেল কিনতে মার্কিন সম্মতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি আর্ট অনুযায়ী অন্যান্য দেশের বাণিজ্যের বিষয়েও আলোচনা হবে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বাজারে ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ। বাণিজ্য ভারসাম্যে এখানে বাংলাদেশ এগিয়ে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশকে আর্ট চুক্তি করতে বাধ্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
খুলনা গেজেট/এনএম

